[english_date], [bangla_time]

শিরোনাম:

বেসামাল মুগদা হাসপাতাল ৩৭ চিকিৎসক-নার্স ডেঙ্গু আক্রান্ত

চিকিৎসাসেবা ভেঙে পড়ার অবস্থায় রাজধানীর মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। মাত্র ৫০০ শয্যার এই হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীই ভর্তি রয়েছে ৩৫৯ জন। পূর্ব ঢাকার একমাত্র সরকারি হাসপাতাল হওয়ায় রোগীর চাপও সক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি। বাধ্য হয়ে হাসপাতাল ওয়ার্ডের ভেতর-বাইরে যেখানেই ফাঁকা পাওয়া গেছে সেখানেই রোগীদের রাখা হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চিকিৎসক ও নার্সদের অসুস্থতা। ফলে আক্রান্তদের সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষকে। হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ বলছে, নিচু এলাকা হওয়ায় সারা বছরই এই হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়

গতকাল সরেজমিনে দেখা যায়, হাসপাতালের জরুরি বিভাগের টিকিট কাউন্টারে রোগীদের দীর্ঘ লাইন। এদের বেশিরভাগই এসেছে জ্বর নিয়ে। চিকিৎসা নিতে আসা এসব রোগীর অধিকাংশই হাসপাতালের আশপাশের এলাকায় বাস করেন। প্রায় সারা বছরই তাদের এলাকার রাস্তাগুলোতে পানি জমে থাকে। ফলে মশার উৎপাতও বেশি। কিন্তু সিটি করপোরেশন মশা নিধন ও ড্রেনেজ লাইনের উন্নয়নে যথাযথ কাজ করছে না বলে অভিযোগ তাদের।

জরুরি বিভাগে কর্মরত চিকিৎসকরা জানান, এই হাসপাতালে প্রায় ৬০ শতাংশ রোগী জ্বর নিয়ে আসে। তাদের উপসর্গ দেখে যদি ডেঙ্গু সন্দেহ হয়, তা হলে এনএস-১ ও সিবিসি পরীক্ষা করানো হয়। পরীক্ষায় ডেঙ্গু শনাক্ত হলে তাদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। আর যাদের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়নি তাদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হয়। ২৪ ঘণ্টাই ডেঙ্গু রোগীদের সেবা দেওয়া হয় বলে জানান তারা।

হাসপাতালের ওয়ার্ডে দেখা যায়, ওয়ার্ডের সব বিছানাই রোগীতে পরিপূর্ণ। মোট রোগীর প্রায় ৭০ শতাংশই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত। স্থান সংকুলান না হওয়ায় রোগীদের ফ্লোর, বারান্দা লিফটের সামনে যেখানেই জায়গা পাওয়া গেছেÑ বিছানা পেতে রাখা হয়েছে। তবে বেশিরভাগ রোগীই মশারি টাঙায়নি। যদিও বেডের রোগীদের জন্য মশারি রয়েছে। কর্তব্যরত নার্স জানান, বারবার বলার পরও রোগীরা মশারি টাঙাচ্ছে না।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক নার্স দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এমনিতেই আমাদের নার্স কম। এখন আবার অনেকেই অসুস্থ। এই হাসপাতালেই কয়েকজন চিকিৎসা নিচ্ছেন। ফলে দুজনের কাজ একজনে করতে হচ্ছে। এভাবে কত দিন করা যায়? হাসপাতাল থেকে যদি বাড়তি নার্স দেওয়া না হয়, তা হলে কয়েক দিন পরে আমাদের সবাইকে এই হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া লাগবে।’

ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সজিব রঞ্জন দেব রূপান্তরকে বলেন, ‘কয়েক দিন আগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছি। এখনো সুস্থ হইনি। কিন্তু হাসপাতালে চিকিৎসক সংকট থাকার কারণে কাজে যোগ দিতে হয়েছে। আমার মতো অনেকেই অসুস্থ থাকার পরও চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছেন।’ অতিরিক্ত কাজের চাপে সবাই ক্লান্ত বলেও জানান তিনি।

হাসপাতাল সূত্র জানায়, ওই হাসপাতালে শুরু থেকেই চিকিৎসক ও নার্স সংকট ছিল। জুলাইয়ে ডেঙ্গুর বিস্তার বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে রোগীর চাপ বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে তা সক্ষমতার বাইরে চলে যায়। বিশাল সংখ্যক এই রোগীদের সেবা দিতে গিয়ে অতিরিক্ত সময় কাজ করতে হয় চিকিৎসক, নার্স ও অন্যদের। এতে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ে। আবার গত দুই মাসে হাসপাতালে কর্মরত ১৫ চিকিৎসক এবং ২২ নার্স ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। জ্বরে আক্রান্ত হয়েও চিকিৎসা নিচ্ছেন কয়েকজন। এতে সংকট আরও চরমে পৌঁছেছে। বাধ্য হয়ে সম্পূর্ণ সুস্থ না হয়েই কাজে যোগ দিতে হচ্ছেন তাদের। এতে তাদের দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন চিকিৎসকরা।

পরিষ্কার করা হয়েছে জমে থাকা পানি

সরকারের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার কীটতত্ত্ববিদরা মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৮০ শতাংশ পাত্রে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে বলে জানায়। এর পরেই নড়েচড়ে বসে হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ। গত শুক্রবার থেকে পরিষ্কার করা হয় ঝোপঝাড়। এ ছাড়া বিভিন্ন পাত্রে জমে থাকা পানিও পরিষ্কার করা হয়। ভবিষ্যতে যাতে আর পানি জমতে না পারে সে বিষয়েও পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের নির্দেশ দেওয়া হয়।

না প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পরিচ্ছন্নতা কর্মী জানান, এত বড় হাসপাতাল; কিন্তু সে অনুযায়ী পরিষ্কার করার লোকবল নেই। আবার ওপরে কাজ চলছে। এর কারণেও সেখানে পানি জমে মশা তৈরি হয়। এলাকা নিচু হওয়ায় অল্প বৃষ্টিতেই পানি জমে। তবে হাসপাতাল থেকে বলা হয়েছে এখন থেকে নিয়মিত পরিষ্কার করতে।

হাসপাতালটির পরিচালক আমিন আহমেদ খান বলেন, এই হাসপাতালে যারা চিকিৎসা নিতে আসেন তাদের বেশিরভাগই মুগদা, মান্ডা, মাতুয়াইল, বাসাবো, খিলগাঁও এবং গোরান নিচু এলাকায় বাস করে। এই এলাকাগুলোতে পানি জমে থাকায় মশার বিস্তারও বেশি। ফলে সারা বছরই এখানে ডেঙ্গু রোগী আসে। আর এই হাসপাতালটি ঝিলের ওপর হওয়ায় এখানে মশা বেশি থাকবেÑ এটাই স্বাভাবিক।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার সকাল ৮টা থেকে রবিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ১৪ ঘণ্টায় এই হাসপাতালে নতুন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছে ৬১ জন। বর্তমানে হাসপাতালে মোট ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছে ৩৫৯ জন। আর চিকিৎসা শেষে ছাড়পত্র নিয়েছেন ১৯৬৩ জন। হাসপাতালটিতে মোট চিকিৎসা নিয়েছেন ২ হাজার ২৮৭ জন। এ ছাড়া ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে এখন পর্যন্ত ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের সব কাগজপত্র স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে পাঠানো হয়েছে। পরীক্ষা করে জানা যাবে তারা ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন কি না?- দেশ রূপান্তর