২৮শে ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ইং, রাত ১২:১০

শিরোনাম:

ফেঁসে যাচ্ছেন আজিমপুর মাতৃসদনের ডা. ইশরাত

৫ কোটি টাকা আত্মসাতের প্রমাণ পেয়েছে দুদক

ফেঁসে যাচ্ছেন ঢাকার আজিমপুর মাতৃসদন ও শিশুস্বাস্থ্য হাসপাতালের সেই তত্ত্বাবধায়ক ডা. ইশরাত জাহান। তার বিরুদ্ধে নিয়মনীতি লঙ্ঘন করে এবং সরকারের নির্ধারিত মূল্য ও প্রচলিত বাজারদর উপেক্ষা করে চড়া দামে ওষুধ ও চিকিৎসা সামগ্রী কেনার ক্ষেত্রে পাঁচ কোটি ২০ লাখ টাকা আত্মসাতের প্রমাণ পেয়েছে দুদক। শিগগির তত্ত্বাবধায়কসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

২০১৭ সালের ১৭ অক্টোবর সকালে প্রসববেদনা নিয়ে হতদরিদ্র পারভীন গিয়েছিলেন আজিমপুরের এই মাতৃসদনে।

সেখানে রেজিস্ট্রেশন করা না থাকায় যন্ত্রণায় কাতর ছিন্নমূল পারভীনকে রাস্তায় বের করে দেওয়া হয়। যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে অবশেষে রাস্তার ওপরেই বাচ্চা প্রসব করতে বাধ্য হন সহায়-সম্বলহীন ওই নারী।

ওই সময় হাসপাতালটির তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্বে ছিলেন ডা. ইশরাত জাহান। এখনও তিনি একই পদে রয়েছেন বহাল তবিয়তে। হাসপাতালের কর্তৃপক্ষ হিসেবে তিনি কি ছিন্নমূল ওই নারীকে অতি জরুরি সেবা থেকে বঞ্চিত করার দায় এড়াতে পারেন? তখন এই প্রশ্ন উঠেছিল। এই প্রশ্ন এখনও আছে।

দুদকে অনুসন্ধানাধীন অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে তত্ত্বাবধায়ক ডা. ইশরাত জাহান বলেন, ‘এ বিষয়ে এই সময়ে কথা বলতে চাই না। কারণ এটা অফিসিয়াল ব্যাপার, যা আমার পক্ষে ডিসক্লোজ করা সম্ভব নয়।’

কেনাকাটায় দুর্নীতি যেভাবে :দুদক সূত্র জানায়, ঔষধ প্রশাসন ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্ধারিত মূল্য তালিকা থাকার পরও খোলাবাজার থেকে ২-৩ গুণ বেশি দরে ওষুধ কিনেছে আজিমপুর মাতৃসদন ও শিশুস্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান। এই দুই প্রতিষ্ঠানের ওষুধের তালিকা ও তালিকায় উল্লেখ করা নির্ধারিত মূল্যের বাইরে ওষুধ কেনার প্রয়োজন হলে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নেওয়ার বিধান রয়েছে।

কিন্তু এ ক্ষেত্রে ওষুধ, সার্জিক্যাল যন্ত্রপাতি ও প্যাথলজি আইটেমগুলো দরপত্রের মাধ্যমে কেনার ক্ষেত্রে এমআরপি ও ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মূল্য তালিকা অনুসরণ করা হয়নি। নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে অবাধে কেনাকাটা করা হলেও মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নেওয়া হয়নি। এভাবে আত্মসাৎ করা হয় ৫ কোটি ২০ লাখ টাকা। হাসপাতালটির ২০১৪-১৫ অর্থবছর থেকে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের কেনাকাটার হিসাব পর্যালোচনা করে টাকা আত্মসাতের প্রমাণ মিলেছে। জালিয়াতির মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করে সংশ্নিষ্টরা দণ্ডবিধির ৪০৯/৪২০/১০৯ ধারা ও ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারা লঙ্ঘন করেছেন, যা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এই কেনাকাটায় মুখ্য ভূমিকা রেখেছেন তত্ত্বাবধায়ক ডা. ইশরাত জাহান।

হাসপাতালটিতে কেনাকাটায় দুর্নীতির এ অভিযোগ অনুসন্ধান করছেন দুদক উপপরিচালক মো. আবুবকর সিদ্দিক। গত ১১ নভেম্বর এই অভিযোগ সম্পর্কে হাসপাতালটির তত্ত্বাবধায়ক ও টেন্ডার-সংক্রান্ত দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সভাপতি ডা. ইশরাত জাহানকে দুদকের প্রধান কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

অভিযোগ রয়েছে, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে সান্ত্বনা ট্রেডার্সকে কার্যাদেশ দিয়ে বাজারদরের চেয়ে উচ্চ মূল্যে ওষুধ ও চিকিৎসা সামগ্রী কেনা হয়। যেমন, প্রতিটি ব্লাড গ্লুকোজ এস্টিমেশন কিটের সরকার নির্ধারিত মূল্য তিন হাজার ৯৬০ টাকা, এটি কেনা হয় সাত হাজার ৫৯২ টাকায়; প্রতিটি এক্স-রে ডেভেলপার অ্যান্ড ফিক্সারের মূল্য এক হাজার ১০০ টাকা, কেনা হয় দুই হাজার ৫৮২ টাকায়। সলিউশন ফর হিউমেলিজারের নির্ধারিত মূল্য এক হাজার ৫৯২ টাকা, কেনা হয় তিন হাজার ৮০৬ টাকায়। প্রতিটি ইনফিউশন হার্টম্যানস সলিউশনের নির্ধারিত মূল্য ৯২ টাকা, কেনা হয় ২০২ টাকায়। প্রতিটি ডিসপোজেবল সিরিঞ্জের নির্ধারিত মূল্য ছয় টাকা ৬০ পয়সা, কেনা হয় ১২ টাকায়। সনি টাইপের ইউএসজি পেপারের নির্ধারিত মূল্য এক হাজার ৩২০ টাকা, কেনা হয় দুই হাজার ৪২২ টাকায়। এভাবে ২০১৪-১৫ অর্থবছর থেকে ২০১৭-১৮ অর্থবছর পর্যন্ত কেনাকাটায় আত্মসাৎ করা হয় পাঁচ কোটি ২০ লাখ টাকা।

অভিযুক্ত যারা :দুদকের অনুসন্ধানে এই জালিয়াতির সঙ্গে আজিমপুর মাতৃসদন ও শিশুস্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধায়ক ও টেন্ডার-সংক্রান্ত দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সভাপতি ডা. ইশরাত জাহান ছাড়াও ১২ জনের সংশ্নিষ্টতা পাওয়া গেছে। তারা হলেন- পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের এমসিএইচ-সার্ভিসেস ইউনিটের সহকারী পরিচালক ডা. কাজী গোলাম আহসান, মাতৃসদন ও শিশুস্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের বিভাগীয় প্রধান (শিশু) ডা. মো. আমীর হোসাইন, হাসপাতালের সহকারী কো-অর্ডিনেটর (ট্রেনিং অ্যান্ড রিসার্চ) ডা. মো. লুৎফুল কবীর খান, জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সিনিয়র স্বাস্থ্য শিক্ষা কর্মকর্তা মো. নাছির উদ্দিন, সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান, মেডিকেল অফিসার (শিশু) ডা. বেগম মাহফুজা দিলারা আকতার, সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. রওশন হোসেন জাহান, জুনিয়র কনসালট্যান্ট (শিশু) ডা. নাদিরা আফরোজ, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের ফিল্ড সার্ভিসেসের ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার মো. নাছের উদ্দিন, সমাজসেবা কর্মকর্তা বিলকিস আক্তার, মেডিকেল অফিসার ডা. আলেয়া ফেরদৌসি ও মেসার্স নাফিসা বিজনেস কর্নারের মালিক শেখ ইদ্রিস উদ্দিন (চঞ্চল)।